শেষ রোজা পর্যন্ত মসজিদে থাকার পরিকল্পনা, বের করে দিলো পুলিশ



শেষ রোজা পর্যন্ত মসজিদে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন একদল মুসল্লি। থাকতেও শুরু করেছিলেন তিনটি মসজিদে। কিন্তু তাদেরকে মসজিদ থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তুর্কি পুলিশের বিরুদ্ধে।

মঙ্গলবার (৪ মে) রয়টার্সের এক খবরে জানা গেছে, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত তিনটি মসজিদ খালি করতে বল প্রয়োগ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। করোনাভাইরাসে চলমান নিষেধাজ্ঞায় এসব মসজিদে অবস্থান করছিলেন ওই মুসল্লিরা।
তারা সবাই একজন ধর্মীয় নেতার অনুসারী। গত রবিবার (২ মে) তুরস্কের গাজিয়ানটেপ প্রদেশের মসজিদে দেখা যায়, বল প্রয়োগ করে মুসল্লিদের বের করে দিচ্ছে পুলিশ। সে সময় কেউ কেউ চিৎকার করে বলেন, ‘আমরা কোরআন পড়ছিলাম’।
মুসল্লিদের মসজিদ থেকে বের করে দিতে একজন পুলিশ কর্মকর্তা পিপার স্প্রেও প্রয়োগ করেন। তুরস্কে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এর বিস্তার রোধে ২৯ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। তবে এ লকডাউনের আওতায় মসজিদে প্রার্থনাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি।
গাজিয়ানটপ প্রদেশের পুলিশের দাবি- মুসল্লিদের একটি দল মসজিদে একটানা অবস্থান করছে। তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই রোজার শেষ দিন পর্যন্ত মসজিদে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছিল।


সময় মাত্র সাত থেকে আট ঘণ্টা। জীবন-মরণ সমস্যায় থাকা একজন রোগীর জন্য এটি অনেক লম্বা হলেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য নেহাত সামান্য। নাটকীয়ভাবেই ঘটেছে ঘটনাটি। দেশের বাইরে থাকা এক কিশোরীর ডাকে সাড়া দিয়ে তার বাবার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছে ইউরোপীয় মুসলিম দেশ তুরস্ক।
পরিবারের সাথে লেয়লা গুলুসকেন নামের ওই কিশোরী থাকেন সুইডেনে। সেখানেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন তার বাবা তুরস্কের নাগরিক ইমরুল্লাহ গলুসকেন। লেয়লা সংবাদমাধ্যমকে জানান, তার বাবা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এমন সন্দেহ হলে চিকিৎসককে খবর দেয়া হয়। বাড়িতে একজন চিকিৎসক আসেন। বাবাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
হাসপাতালে নেয়ার পর লেয়লার বাবার শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। কিন্তু ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এরপর ভালো চিকিৎসা করাতে মরিয়া হয়ে ওঠে পরিবার। কিন্তু লেয়লাদের মনে হতে থাকে সুইডেনের হাসপাতালে তার বাবাকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। ঠিকভাবে চিকিৎসাও দেয়া হচ্ছে না। নিজ দেশের ওপর প্রবল আস্থা লেয়লার। দেশটির নেতা রজব তাইয়েব এরদোগানের প্রতি তার প্রচণ্ড বিশ্বাস।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পরিবারের এই কঠিন সময়ে দেশের কাছে প্রিয় নেতার কাছে কিছু চাইবেন। প্রবাসে থেকেই তিনি বাবার স্বাস্থ্যের অবস্থা জানিয়ে টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। এতে তিনি তার বাবার সর্বশেষ অবস্থা জানান এবং বলেন, সুইডেনে তারা ঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ২১ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তিনি দেশকে পাশে পাওয়ার আবেদন জানান।

লেয়লার বোন সামিরা গুলুসকেন ভিডিওটি শেয়ার দেন। সেখানে সামিরা লিখেন, আমরা আমার পরিবারের সাথে সুইডেনে থাকি। আমার বাবার ১১ দিন আগে জ্বর হয়। সাথে শ্বাসকষ্ট। আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক্তার ডাকলাম। কিন্তু তারা আমাদের যাকে সাড়া দিলো না। পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। প্রতিদিন অনেকবার ফোন করেছি। কিন্তু তারা আসেনি। এরপর তিনি সাহায্যের আবেদন জানান।

লেয়লার এই অনুরোধ নজরে আসে তুরস্কের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা: ফাহরুদ্দিন খোজার। তিনি তার ভেরিফায়েড আইডি থেকে লেয়লার অনুরোধে সাড়া দিয়ে লেখেন, ‘প্রিয় লেয়লা, আমরা তোমাকে শুনতে পেয়েছি। বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আমরা সুইডেনে আসছি। সকাল ৬টায় আমরা রওয়ানা দিচ্ছি। এমন সময় আমি দূরে থাকার জন্য দুঃখিত। তুরস্কের হাসপাতাল ও চিকিৎসক তোমার বাবার চিকিৎসা করতে প্রস্তুত। আমাদের প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা নিও। তুরস্কের সব মানুষের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি অনেক ভালোবাসা।’

এর পর সুইডেনের মালমো বিমানবন্দরে পৌঁছায় জিএমটি ০৭০০ বিমান। সুইডেন থেকে করোনায় আক্রান্ত ৪৭ বছর বয়সী ইমরুল্লাহ গলুসকেন এবং তার তিন কন্যাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হয় মাত্র সাত থেকে আট ঘণ্টার ব্যবধানে। পরে শুরু হয় চিকিৎসা তৎপরতা। রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পর ইমরুল্লাহ গলুসকেন এবং তার তিন কন্যাকে আঙ্কারার ইহির হাসপাতালে নেয়া হয়।

তুরস্কের এমন পদক্ষেপে মুগ্ধ হন লেয়লা গুলুসকেন। সেইসাথে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঘটনাটি ফলাও করে প্রচার হওয়ায় প্রশংসার জুয়ারে ভাসতে থাকে দেশটি। এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হতে থাকে সুইডেন সরকারের। দেশে ফেরার পর লেয়লা টুইটে লিখেন, ‘আমি জানতাম আমার দেশ আমাকে সমর্থন করবে। এই কঠিন সময়ে দেশ আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফাহরুদ্দিন খোজাকে ধন্যবাদ জানাই। আল্লাহ আমাদের দেশকে রক্ষা করুন।’

লেয়লা আরো লিখেন, ‘তুরস্কের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন আমার টুইটের জবাব দিয়েছেন, এর পর থেকে তুর্কি কর্মকর্তারা আমার সাথে অনবরত যোগাযোগ করে গেছেন। আল্লাহ আমাদের দেশকে রক্ষা করুন।’

গলুসকেন ও তার পরিবারকে বহনকারী এই বিশেষ ফ্লাইট দেশে ফেরার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী খোজা লেয়লাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ওই কন্যা যা করেছে, সেটা উদাহরণ হয়ে থাকবে। তার আহ্বানে আমরাও দ্রুত সাড়া দিয়েছিলাম।’

তুরস্কের যোগাযোগ পরিচালক ফাহরুদ্দিন আলতুন এক টুইটে বলেন, ‘তুরস্কের নাগরিক ইমরুল্লাহ গলুসকেন সুইডেনে ভাইরাসে পজিটিভ ধরা পড়লেও তার চিকিৎসা হয়নি। আমরা তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তুরস্কে নিয়ে এসেছি।’

ইমরুল্লাহ গলুসকেনের নিবিড় চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসার নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট স্বয়ং।

Post a Comment

Previous Post Next Post