ব্যক্তিগত জমা-খরচের মতো বিনিয়োগের কাজটিও খুব কম লোকই ঠিকঠাক করতে পারেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত জীবনের জমা-খরচে ভারসাম্য রাখতে পারেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৮ শতাংশ কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণী। এবং সেখানকার মাত্র ১৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আয়-ব্যয় এবং সঞ্চয়-বিনিয়োগে পারদর্শি। বাকি ৮২ শতাংশের অবস্থা মোটেই ভাল না।
টাকা-পয়সার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই ব্যাপক চাপে থাকেন। অনেকেই আর্থিক ব্যবস্থাপনার কাজটিকে অনেক জটিল মনে করেন। কিন্তু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হ্যারল্ড পোলক এমন কিছু কৌশলের কথা বলেছেন যেগুলো মেনে চললে ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার কাজটি অনেক সহজ হয়ে যাবে। ব্লুমবার্গে প্রকাশিত রিপোর্টের আলোকে কৌশলগুলো তুলে ধরা হল-
boss-administrator-counting-his-salary-in-his-officeখরচের আগেই জমা করুন
প্রফেসর পোলক বলেন, যতই আয় করুন না কেন, তার ১০ থেকে ২০ শতাংশ জমাতে হবে। তিনি মনে করেন, অধিকাংশ মানুষই তাদের আয়ের এক পঞ্চমাংশ জমাতে ব্যর্থ হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানি বেতনের মাত্র ৩ শতাংশ কেটে রাখে পেনশনের জন্য। কিন্তু তা খুবই কম।
সঞ্চয় না থাকলে ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বা পুঁজিবাজার কোথাও বিনিয়োগের চিন্তা করতে পারবেন না। তাই দিন দিন সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়ান। সঞ্চয় অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল।
আর্থিক দুরবস্থার জন্য তৈরি থাকুন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের হাউজহোল্ড সার্ভে থেকে দেখা যায় প্রায় ৫০ শতাংশ উত্তরদাতাই জরুরি প্রয়োজনের সময় মাত্র ৩০ হাজার টাকাও জোগাড় করতে পারেন না। হয় তাদেরকে জিনিসপত্র বেচতে হয় অথবা ঋণ নিতে হয়। তাই চাকরি থেকে অবসর সময়ের জন্য যেমন জমা করতে হবে তেমনি জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যও জমা করা শুরু করুন।
ইনভেস্টরস মেনিফেস্টো বইয়ের লেখক উইলিয়াম বার্নস্টেইন বলেন, পেনশনের জন্য সঞ্চয়ের আগে জরুরি প্রয়োজনের জন্য সঞ্চয় শুরু করা ঠিক নয়। বাসা ভাড়া কমিয়ে বা রুমমেট জোগাড় করে হলেও সঞ্চয় শুরু করুন। চাকরিতে বেতন বৃদ্ধির সাথে সাথে জরুরি সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ানো উচিত।
বিনিয়োগ হতে হবে বৈচিত্র্যপূর্ণ
একজন সফল বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োগের পুরোটা এক জায়গায় পুঞ্জিভূত করেন না। অর্থায়ন এবং বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা ভাল ভাল কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে বলেন। তাছাড়া সঠিক সময়ে সঠিক শেয়ারটি কেনাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বিনিয়োগ কোথায় কোথায় বরাদ্দ করবেন তার উপর নির্ভর করবে মুনাফার পরিমাণ।
ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, বন্ড এবং পুঁজিবাজারে ভাগ ভাগ করে বিনিয়োগ করতে পারেন। আবার আপনার বিনিয়োগ যদি শুধু পুঁজিবাজারে থাকে তাহলে একটি মাত্র কোম্পানির শেয়ারে সব টাকা বিনিয়োগ করবেন না। তাতে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। আপনার বিনিয়োগ পোর্টফোলিও সাজানোর জন্য অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন।
stock-market-investment
বিনিয়োগ পরামর্শকের পেছনে খরচ করুন
অনেকেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ পরামর্শক বা উপদেষ্টাদের ফি দিতে চান না। নিজের বুদ্ধিতেই বিনিয়োগ করতে চান। অথচ সামান্য ফি দিয়েই একজন অভিজ্ঞ এবং দক্ষ বিনিয়োগ কৌশুলির পরামর্শ মোতাবেক নিজের পোর্টফোলিও সাজিয়ে নিলে আপনার বিনিয়োগ ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। রিটার্ন বেশি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় ফি বাবদ মাত্র ১ শতাংশ খরচ করলে আপনার মুনাফা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু অনেকেই এই খরচটি করতে চান না।
কম মুনাফা আসে এমন শেয়ারেও বিনিয়োগ করুন
বাজারে সাধারণত বেশি মুনাফা দেয় এমন শেয়ারে বিনিয়োগের চেষ্টা সবাই করেন। এসব কোম্পানির শেয়ারে যেমন বেশি লাভ করা সম্ভব তেমনি বাজারে ধস নামলে অনেক বেশি ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এমন কিছু কোম্পানির শেয়ার আছে যারা অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক। মানে বাজারে ধস নামলেও এদের শেয়ারের দাম তেমন কমে না । আবার লাভ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এরা একটু পিছিয়ে থাকে। বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানিকে পাত্তা দিতে চান না কারণ এরা লাভ বেশি দেয় না। অথচ একজন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারী তার পোর্টফোলিও সাজাতে এসব কোম্পানির শেয়ারের বিনিয়োগের একটি অংশ রাখেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে শীর্ষ ধনী ওয়ারেন বাফেট বেছে বেছে কম মুনাফা দেয় কিন্তু কখনোই লোকসানের মুখে পড়ে না এমন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করতেন। ২০১৩ সালে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ট্রাস্টিদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে পরামর্শ দেন, ‘মোট সম্পদের ১০ শতাংশ স্বল্পমেয়াদী সরকারি বন্ড এবং ৯০ শতাংশ কম মুনাফার শেয়ারে বিনিয়োগ করুন। দ্রুত লাভ না হলেও দীর্ঘমেয়াদে মুনাফার নিশ্চয়তা দেবে এই পলিসি।’
little-girl-counting-moneyআয়ের চেয়ে ব্যয় কম করুন
আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের সহজ সূত্র হচ্ছে- যত আয় করবেন ব্যয় হতে হবে তার চেয়ে কম।
২০১৪ সালে ফিন্যান্সিয়্যাল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৩ শতাংশ তরুণ এবং ১৯ শতাংশ চল্লিশোর্ধ ব্যক্তি আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করেন।
দেখা গেছে যারা আয়ের চেয়ে কম ব্যয় করেন তারা যেকোন আর্থিক দুর্বিপাকে আটকা পড়েন না। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন এবং ক্রেডিট কার্ডের সহজলভ্যতায় যখন তখন এটাসেটা কিনতে প্রলুব্ধ হচ্ছেন অনেকেই। এতে ব্যয় যেমন বেড়ে যায় তেমনি বেশি বেশি সুদ এবং সার্ভিস চার্জের ভার বহন করতে হয়।
মাথা ঠান্ডা রাখুন
বিনিয়োগ ক্ষেত্রে বুঝে-শুনে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাছাড়া বাজারে গুজব রটলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। সব খবরের সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিন। অসমর্থিত কোনো সূত্রের উপর নির্ভর করবেন না। একজন ভাল এবং বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারী হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না।
