বিমা খাতের শেয়ারের আবারও অস্বাভাবিক উত্থান শুরু হয়েছে পুঁজিবাজারে।কয়েক দিন ধরে এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটিকে কারসাজির সন্দেহ বলে মনে করছেন। তবে তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তৎপর হতে হবে। কারন বিমা খাতের শেয়ারের ইস্যুতে বিএসইসির নিরব ভুমিকা পালন করছে।
অভিযোগ রয়েছে পুঁজিবাজার থেকে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করলে শত শত কোটি টাকার আয়ের উৎস বেড়িয়ে আসবে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিমার শেয়ার নিয়ে প্রথম র্যালিটি হয়েছিল গত বছরের আগস্ট-নভেম্বরে। তখন এ খাতের কোনো কোনো শেয়ারের দাম ৪-৫ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। পরে ওই দাম কমতে শুরু করে। তাতেই বেশি দামে শেয়ার কিনে সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
গত বছর একটি সংঘবদ্ধ চক্র কারসাজির মাধ্যমে বিমার শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটায়। নানা তদন্তে সেসব কারসাজিকারকদের নামও বেরিয়ে আসে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন এসে আবারও পুরোনো কারসাজিকারকেরা বিমা শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে মেতেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বীমা খাতের ১২ কোম্পানির শেয়ার দর এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৪৫ শতাংশ থেকে ১৭৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর আগেও এসব কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে পাঁচ গুণ। কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে কারসাজিকারীরা ফের বেপরোয় হয়ে উঠেছে। এসব শেয়ার থেকে সমূহ দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তবে পুঁজিবাজারে কয়েক মাস ধরে শেয়ার কারসাজি নিয়ে আলোচনার শীর্ষে বীমা খাত। যৌক্তিক কারন ছাড়াই একটি চক্র এই খাতের শেয়ার দর বাড়াচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে নিরব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের এই নিরব ভূমিকার কারনেই ব্যাংকের থেকে লভ্যাংশে পিছিয়ে থেকেও শেয়ার দরে কয়েকগুণ বেশিতে এখন বীমা খাত। এই বৃদ্ধিতে কারসাজির বিষয়টি প্রমাণসহ গণমাধ্যমে আসলেও কমিশন তাতে কর্ণপাত করেনি। এখনো বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ অনাস্থা।
এই কোম্পানিগুলোকে অনেকেই প্রতারক হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন নাটকেও বীমা কোম্পানিতে চাকরী করা মার্কেটিং অফিসারদের দূর্দশা ও তাদেরকে যে কি পরিমাণ হাসির পাত্র হতে হয়, তা তুলে ধরা হয়। কিন্তু সেইসব কোম্পানির শেয়ারই অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরে।
তবে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বীমা কোম্পানির শেয়ার নিয়ে একটি গ্রুপের কারসাজির খতিয়ান তুলে ধরা হলেও দর্শক ভূমিকা পালন করে বিএসইসি। স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও বীমায় গেম্বলারদেরকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। তারা অন্যসব খাতের শেয়ার অস্বাভাবিক বাড়ার ক্ষেত্রে কারন জানতে চাইলেও বীমায় অনেকটা নিরব। এ নিয়ে রয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ।
সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব ফেরাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর ফলে পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাবও ফিরতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে কারসাজি চক্র বাজারকে ম্যানুপুলেট করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে। তারা কোনো কারণ ছাড়াই স্বল্প মূলধনী ও দুর্বল মৌলের কিছু শেয়ার দর আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
এখন কোম্পানিগুলো সম্পর্কে নানা রকম গুজব ছড়াচ্ছে, যাতে কোম্পানিগুলোর শেয়ারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর আকাশচুম্বী দরের এসব শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাঁধে ফেলে অনায়াশে তারা সটকে পড়তে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে অদৃশী শক্তি ১৯৯৬ সালে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রাস্তার নিয়ে খেলেছিলেন, তারাই আবার নতুন রুপে নুতন কিছু পুঁজিপতি নিয়ে অশুভ খেলায় মেতেছেন। এ শক্তিটিই খেলেছে ২০১০ সালেও। মূলত ২০১০ সালের ধস পরবর্তী সময়ে বিপর্যস্ত বাজারে যতবার আশার আলো দেখা গেছে, এ চক্রটির কারণেই সেই আলো বার বার নিবে গেছে।
এক ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বীমা কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করলেই ডিএসই থেকে চিঠি দিয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। এক্ষেত্রে বিক্রি করে দেওয়া ওই নির্দিষ্ট বীমা কোম্পানির বিনিয়োগের তথ্য চাওয়া হয়। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বীমার শেয়ার বিক্রিতে আতঙ্ক তৈরী করা হয়। এটা কখনোই স্বাভাবিক লক্ষণ না। দেখা গেছে, ২০২০ সালের ব্যবসায় ১৫টি ব্যাংক ও ১০টি বীমা কোম্পানির পর্ষদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে ব্যাংকের গড় লভ্যাংশ ঘোষণার পরিমাণ ১৬.৪০ শতাংশ। আর বীমা কোম্পানির গড় ১৪.৫০ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক মাসের কম সময়ে তালিকাভুক্ত ১২টি কোম্পানির শেয়ার দর ৪৫ শতাংশ হতে ১৭৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এসব শেয়ার কিছুদিন আগেও দ্বিগুণ, তিনগুণ হারে বেড়েছে। তারপর কিছুদিন বিরতি দিয়ে এসব শেয়ার নিয়ে ফের কারসাজিতে মেতেছে তারা। এখন বাজারে গুজব ছড়াচ্ছে, বীমা খাতের কোন শেয়ারই ১০০ টাকার নিচে থাকবে না। কোন কোন শেয়ার দর ২০০ টাকার বেশি হয়ে যাবে।
কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে সদ্য তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি দেশ জেনারেল ইন্সুরেন্স, প্রভাতী ইন্সুরেন্স, বিএনআইসিএল ইন্সুরেন্স, ফেডারেল ইন্সুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্সুরেন্স, অগ্রণী ইন্সুরেন্স, পূরবী ইন্সুরেন্স, ঢাকা ইন্সুরেন্স, সোনারবাংলা ইন্সুরেন্স, নর্দার্ন ইন্সুরেন্স ও প্রাইম ইন্সুরেন্সের।
দেশ জেনারেল ইন্সুরেন্স: কোম্পানিটি গত ২৯ মার্চ অভিহিত মূল্যে পুঁজিবাজারে আসে। প্রথমদিন কোম্পানিটির শেয়ার ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে লেনদেন হয় ১৫ টাকায়। পরের দিনও ৫০ শতাংশ দর বৃদ্ধি নিয়ে উঠে ২২ টাকা ৫০ পয়সায়। এরপর টানা ১০ শতাংশ দর বৃদ্ধি নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার ৪১ টাকায় লেনদেন হয়েছে। এরমধ্যে দর বেড়েছে ১৭৩ শতাংশ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্য আয় অনুপাত (পিই) অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ার দর ২৬ টাকার পরই ঝুঁকিতে পড়েছে। এখন মহাঝুঁকিতে রয়েছে। কোম্পানিটির বর্তমানে পিই ৬১.৫০।
প্রভাতী ইন্সুরেন্স: গত ২৪ মার্চ ডিভিডেন্ড ঘোষণার পর কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৭৫ টাকা ১০ পয়সা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১২৫ টাকা ৬০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৬৭.২৪ শতাংশ। ঘোষিত ১৭ শতাংশ বোনাস ডিভিডেন্ড বিবেচনায় নিলে এর বৃদ্ধির হার আরও বাড়বে। কোম্পানিটির বর্তমান পিই ৪০.৫২।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্সুরেন্স কোম্পানি (বিএনআইসিএল): গত ২৪ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৬৫ টাকা ৯০ পয়সা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১০৯ টাকায়। দর বেড়েছে ৬৫.৪০ শতাংশ। কোম্পানিটির পিই ৫২.৭৪।
ঢাকা ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৩৫ টাকা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৫৩.৫০ টাকায়। দর বেড়েছে ৫২.৮৫ শতাংশ। কোম্পানিটির ঘোষিত ডিভিডেন্ড বিবেচেনায় নিলে দর বেড়েছে ৬০ শতাংশ।
প্রাইম ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ২৯ টাকা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪২ টাকা ৮০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৪৭.৫৮ শতাংশ। ঘোষিত ডিভিডেন্ডে বিবেচনায় নিলে দর বেড়েছে ৬২.৩৪ শতাংশ।
ক্রিস্টাল ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৩২ টাকা ৪০ পয়সা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৫২ টাকা ৩০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৬১.৪২ শতাংশ।
ফেডারেল ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ১৭ টাকা ৫০ পয়সা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২৭ টাকা ৬০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৫৭.৭১ শতাংশ।
পূরবী ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ২৪ টাকা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৩৫ টাকা ৯০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৪৯.৫৮ শতাংশ।
সোনারবাংলা ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৪২ টাকা ৮০ পয়সা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৬৩ টাকা ১০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৪৭.৪২ শতাংশ।
নর্দার্ন ইন্সুরেন্স: গত ৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ২৯ টাকা ৬০ পয়সা। সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪২ টাকা ৯০ পয়সায়। দর বেড়েছে ৪৫ শতাংশ।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ নিজেই প্রশ্ন করেছেন, ‘বিমায় কী আছে? কী কারণে এর দর এত বাড়ছে? বিমার এজেন্ট কমিশন বন্ধ করা, যানবাহনে বিমা বন্ধ করা এসব কিছুর সঙ্গে শেয়ারের দর বাড়ার কোনো কারণ দেখি না। কিন্ত বাস্তবে বিমার শেয়ারের দরই বাড়ছে। নিশ্চিত কারসাজি আছে।’ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থেকে বিমা খাতে বিনিয়োগ করার পরামর্শ এই পুজিবাজার বিশ্লেষকের। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের এ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ নেই।
এ বিষয় সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম বলেন, ‘পুঁজিবাজারের কোন কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়বে কোন কোম্পানির শেয়ারের দর কমবে, সেটি দেখার দায়িত্ব কমিশনের নয়; বরং এই দর বৃদ্ধি ও কমার মধ্যে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব কমিশনের। এই খাত নিয়ে কারসাজি হচ্ছে বলে সন্দেহ তো আছে?’
সূএ: শেয়ারবার্তা ২৪
